প্রাইম ব্যাংক
Home » জাল স্বাক্ষরে প্রাইম ব্যাংকের গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
অপরাধ টপ ফোর ঢাকা সব খবর

জাল স্বাক্ষরে প্রাইম ব্যাংকের গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

সাভার প্রতিনিধি: পোশাক কারখানায় ১০ বছর চাকরি করেছেন মাহমুদা নাছরিন। স্বামী পেশায় গাড়িচালক। প্রায় ২৫ বছর ধরে অনেক কষ্টে কিছু টাকা সঞ্চয় করেছেন তারা। পরে সঞ্চয়ী হিসাব খুলেছিলেন প্রাইম ব্যাংকের আশুলিয়ার গণকবাড়ি শাখায়। গত সেপ্টেম্বর মাসে বাসায় চেক বই খুঁজে না পেয়ে ব্যাংকে ছুটে যান মাহমুদা। সেখানে গিয়ে দেখেন, তার সঞ্চয়ী হিসাব থেকে ২ লাখ টাকা হাওয়া। মাহমুদার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। বহু কষ্টে জমানো টাকা তুলে নিয়েছেন ‘আকাশ’ নামের এক ব্যক্তি। ওই ব্যক্তি তার অপরিচিত। অথচ নিয়ম আছে, গ্রাহকের পক্ষে কেউ চেক বইয়ের মাধ্যমে ৩০ হাজার টাকা তুললেও ব‌্যাংক থেকে গ্রাহককে ফোন করতে হয়। আর ২ লাখ টাকা তুলে নেওয়ার ক্ষেত্রে তার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি জমা নিতে হয়। এসব বিষয়ে ব‌্যাংকের অ‌্যাকাউন্টস অফিসার আনোয়ার হোসেনের কাছে জানতে চান মাহমুদা। এতে ক্ষিপ্ত হন ওই কর্মকর্তা। মাহমুদাকে নানা কটু কথা শোনান তিনি।

গত ২৮ অক্টোবর এ বিষয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ জানান মাহমুদা নাছরিন। ব্যস্ততার কারণে এখন পর্যন্ত এ ঘটনা তদন্ত করা যায়নি বলে জানিয়েছেন আশুলিয়া থানার উপ-পরিদর্শক জসিম উদ্দিন।

অভিযোগপত্রে মাহমুদা নাছরিন জানান, গত ১১ অক্টোবর বাসায় চেক বই খুঁজে না পেয়ে দ্রুত ব্যাংকে যান তিনি। তার সঞ্চয়ী হিসাব থেকে ২ লাখ টাকা তোলা হয়েছে বলে জানান অ‌্যাকাউন্টস অফিসার আনোয়ার হোসেন। আকাশ নামের এক ব্যক্তি মাহমুদা নাছরিনের চেক দিয়ে টাকা তুলেছেন বলে জানান ওই ব‌্যাংক কর্মকর্তা। তবে মাহমুদা আকাশকে চেনেন না। চেকের পাতায় স্বাক্ষরও করেননি তিনি।

মাহমুদা বলেন, ‘১৪ বছর বয়সে আমার বিয়া হয়। সংসারে অভাবের কারণে ১৯৯৬ সালে টাঙ্গাইল থাইকা ঢাকায় চইলা আসি। স্বামী রেজাউল করিমও আমার সাথেই আসে। আমি চাকরি নেই ইপিজেডের গার্মেন্টস কারখানায়। আর স্বামী ছোট্ট একটা কসমেটিকসের দোকান দেয়। তখন থাইকা আমি অনেক কষ্ট করছি। শ্রীপুরের খান কলোনি থাইকা ৪০-৪৫ মিনিট হাঁইটা গার্মেন্টসে গেছি। গাড়িভাড়ার ৫-৬ টাকা বাঁচাইছি। অফিসে দুপুরের টিফিন না খাইয়া সেই ট্যাকাও জমাইছি। ইনক্রিমেন্ট আর ওভারটাইমের টাকাও জমাইছি। স্বামী শখ কইরা কিছু কিনতে টাকা দিলে হেইডাও কিনি নাই। মাসে ২০০-৫০০ টাকা স্বামীরে না জানাইয়া গোপনে পোস্ট অফিসে রাখছি। চাকরি করার সময়ই দুই মেয়ে ও এক ছেলের মা হই। ছেলে-মেয়ের দেখাশুনা কইরা চাকরি করা কষ্ট হইতেছিল। এ কারণে দশ বছর পর চাকরি ছাইড়া দেই। ২০১২ সালে পোস্ট অফিস থাইকা জমানো ৫০ হাজার টাকা তুইলা গ্রামের বাড়িতে মায়ের কাছে পাঠাই। টাঙ্গাইলে মা কিছু জমি বর্গা নিয়া চাষ করতো। ছাগল কিনে দিছিলাম, সেগুলা মা পালতো। চাকরি ছাড়ার পর কখনও বইসা থাকি নাই। বাড়ির পাশে মাইনসের পতিত জমিতে চাষ করতাম। সেই শাক-সবজি বেচছি, দর্জির কাম করছি। হেই টাকা মাসে মাসে নিজের কাইছে জমায় রাখছি। হ‌্যার পর মায়ের কাছ থেকে টাকা আইনা শ্রীপুরের খান কলোনিতে ৩ শতাংশ জমি কিনি। এইখানে একটা ছোট্ট টিনের ঘর তুইলা থাকি।’

প্রাইম ব্যাংকে টাকা সঞ্চয়ের ব্যাপারে মাহমুদা বলেন, ‘তিন-চার বছর আগে একজনের পরামর্শে প্রাইম ব্যাংকে অ‌্যাকাউন্ট খুলছি। তখন কিছু টাকা রাখছিলাম। বছরে বছরে ৮০ হাজার, ৫০ হাজার, ২০ হাজার, ১০ হাজার করে টাকা রাখছি। যখনই হাতে কিছু টাকা জমতো তখনই ব্যাংকে রাখতাম। অ‌্যামনে কইরা সাড়ে ৩ লাখ টাকা আমার অ‌্যাকাউন্টে জমা হয়।

গত ১১ অক্টোবর বাসায় রাখা চেক বইটা খুঁইজা না পাইয়া ব্যাংকে যাই। তখন জানতে পারি, আকাশ নামে একজন ২ লাখ টাকা তুলে নিয়ে যায়। আমি তো কাউকে চেক দেই নাই। আর আকাশ নামে কাউকে চিনি না। ব‌্যাংকের অফিসারকে বলি, এতগুলা টাকা দিলেন আমাকে ফোনও দিলে না। ভোটার আইডি কার্ডও রাখেন নাই। এসব কথা বললে শাহিন ও আনোয়ার নামের দুই অফিসার আমারে যাচ্ছেতাই বলে। আমারে পাগল সাব্যস্ত করে। যে নামে টাকা তুইলা নিয়া গেছে, তার সে চেকটাও দেখাতে চায় নাই। তারা বলেন, আমি চেক দিছি, তাই তারা টাকা দিয়া দিছে। এখানে তাদের কিছুই করার নাই। পরে ম্যানেজারের কাছে গিয়া ওই চেকের ছবি তুইলা আনি।’

মাহমুদা বলেন, ‘গত ২৮ সেপ্টেম্বর দ্যাশের বাড়ি টাঙ্গাইলে বেড়াতে গেছিলাম। ওই সময় খেলতে গিয়ে পুকুরে ডুইবা আমার ছেলে-মেয়ে মারা যায়। মেয়ে নাজনিনের বয়স ১১ আর ছেলে সাকিব ৯ বছরের ছিল। ছেলে-মেয়ে পানিতে ডুবে মারা গেছে, তাই আমার মাথা ঠিক নাই বলে ব্যাংক থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।’

প্রাইম ব্যাংকের অ‌্যাসিস্ট‌্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট ও হেড অব ব্রাঞ্চ শাহতাব রিজভীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব‌্যাংকে গিয়ে সাক্ষাৎ করতে বলেন। আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জিয়াউর রহমান জিয়া বলেন, ‘ব্যাংকের এক গ্রাহকের অ‌্যাকাউন্ট থেকে ২ লাখ টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে তুলে নেওয়ার অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি সেন্সিটিভ। তাই অধিকতর তদন্ত প্রয়োজন। তদন্ত করে এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ইমরান খান,