Home » মাছের রাজা ইলিশের সাতকাহন
বিশেষ সংবাদ সব খবর

মাছের রাজা ইলিশের সাতকাহন

Spread the love

।।মনির ফয়সাল।।

বঙ্গ জীবনের অঙ্গ ইলিশ নিয়ে যুগে যুগে বহু কাব্য গাঁথা হয়েছে। মঙ্গলকাব্য থেকে সত্যেন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব বসুর দীর্ঘ সফর। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো দু–একজন ছাড়া ইলিশ–গল্পের ভাঁড়ারও যে ঠাসা তার বিস্তারিত মঈনুল হাসান ও মোজাফ্ফর হোসেন। তাঁদের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে এক দুর্লভ ইলিশ–সংগ্রহ ‘কল্পে গল্পে ইলিশ’। ২৬৫ পাতায় প্রাপ্তি ৩৪টা ছোটগল্প। লেখক তালিকায় রয়েছেন প্রমথনাথ বিশী, গুলজার, নোংথোম্বম কুঞ্জমোহন সিংহ, শৈবাল মিত্র, অমর মিত্র, ইমদাদুল হক মিলন, আফরোজা পারভীনের মতো নামীদামি লেখকেরা।

এঁরা গল্পে ইলিশকে কেবল সাংস্কৃতিক কিংবা অর্থনৈতিক উপকরণ হিসাবে চিহ্নিত করতে চাননি, রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে নানা ধরনের বঞ্চনার প্রতীক হিসেবেও তুলে এনেছেন। এক দরিদ্র স্কুলশিক্ষক পাকেচক্রে একটি ইলিশ কেনে। আস্ত ইলিশ কারও হাতে দেখলে দাম জিজ্ঞেস করাই বাঙালির দস্তুর। ট্রামে মুখ ফসকে কম দাম বলে ফেলে সেই স্কুলশিক্ষককে কী হয়রানির শিকার হতে হয়, তার সরস এবং বেদনাময় এক গল্প উপহার দিয়েছেন প্রমথনাথ বিশী— ‘গঙ্গার ইলিশ’।

বাংলা প্রবাদ আছে ঘরামির ঘর ছেঁদা। যে জেলে ইলিশ ধরে অন্যের স্বপ্নপূরণ করে, দারিদ্রতায় তার নিজের ঘরেই ইলিশ চাখার অবসর দেয় না। চাউবা একটাই মাত্র ইলিশ ধরে ঘরে ফিরে আসে। এ মাছ সে বিক্রি করবে না, আসন্নপ্রসবা বড় মেয়েকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াবে। ছোট ছেলেমেয়েরা যখন ইলিশে মশগুল, তখনই ঘরে চাল নেই বলে সেই ইলিশকেও বিক্রি করে দিতে হয় চাউবাকে। ‘একটি ইলিশের স্বাদ’–এ হৃদয়বিদারক কাহিনী বুনেছেন নোংথোম্বর কুঞ্জমোহন সিংহ।

গয়না বা শাড়ি নয়, একটা ইলিশও যে যুযুধান দম্পতির মিলন ঘটাতে পারে, ফিরিয়ে দিতে পারে পুরনো ভালবাসা, হোসেনউদ্দীন হোসেন ভারি সুন্দরভাবে ফুটিয়েছেন ‘ইলিশ’–এ। কেউ গল্পে রূপকথাও এনেছেন। যেমন ইমদাদুল হল মিলন। ‘ছোট্ট হরিণ ও ইলিশ মাছ বাজি ধরেছিল’— এক অন্য ধরনের বন্ধুত্বের গল্প। দারিদ্র্য আর ইলিশের সম্পর্ক যেন মাখামাখি। তাই সংসারের একমাত্র রোজগেরে ছেলের গোপনে মাছ কিনে এনে রাতে মাকে দিয়ে ভাজিয়ে খাওয়া এবং তারপর একে একে বাবা ও ভাইবোনেদের জেগে উঠে ভাগ নেওয়া। সমাজের এক করুণ বাস্তব এবং একই সঙ্গে মানবিক ছবিটা খুঁজে পাওয়া যায় শৈবাল মিত্রের ‘ইলিশের রাত’–এ। ইলিশ ধরতে গিয়ে আঁধির কবলে পড়ে হারিয়ে যায় সেকান্দার। তার সিতারা রোজ পথ চেয়ে থাকে। মঈনুল হাসানের ‘বেনে বৌ’ মন বিষণ্ণ করে তোলে।

বর্ষা এল অথচ পাতে এক টুকরো ইলিশ পড়ল না, দুটো গরম ভাত ইলিশের তেল মেখে খাওয়া গেল না, মুচমুচে ভাজা ইলিশ মাছের ডিম চাখা গেল না— জীবন যেন বর্ণহীন হয়ে পড়ল। বলা যায়, বাঙালি জীবনে ইলিশ জুড়ে আছে, পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অনুসঙ্গ হিসাবে।

রূপালী ইলিশ বা সিলভার গোল্ড বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। মাছের রাজা ইলিশের বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে Hilsa ilisha. ১৮২৯ সালে Clupea ilisha নামকরণ করেছিলেন ১৮৭৮ এর নামকরণ করেছিলেন Clupea ilisha। Regan ১৯১৭ সালে ইলিশের গণ (genus) এর নামকরণ করেছেন Hilsa. Fowler ১৯৩৪ সালে সালে রূপালী ইলিশ নামকরণ করেছেন Tenualosa পরবর্তীতে Munro ১৯৫৫ তার ‘Marine and freshwater fishes of Ceylone’ শিরোনামের গ্রন্থে Fowler এর দেয়া নাম Tenualosa বলেই এর বর্ণনা করেছেন। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান-উপ মহাদেশের প্রায় সব মৎস্য বিশেষজ্ঞ যথা Hora, Alikunhi, Jhingran, Talwar, Srivastava, Bhuiyan, Rahman সহ অন্যান্য বিশেষজ্ঞগণ তাদের প্রকাশনায় স্বাদুপানির এই ইলিশকে Hilsa ilisha বলেই বর্ণনা করেছেন। আতাউর রহমান তার Freshwater fishes of Bangladeesh বইয়ের প্রথমদিকের সংস্করণে Hilsa ilisha বলেই উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সর্বশেষ সংস্করণে তিনি মাছটিকে Hilsa ilisha না বলে Tenualosa ilisha বলে বর্ণনা করেছেন।

বাংলাদেশের তথা স্বাদুপানির ইলিশের (river shad, freshwater shad) নাম Hilsa ilisha নাকি Tenualosa ilisha ? বেশীরভাগ মৎস বিজ্ঞানীরা স্বাদুপানির এই ইলিশের নাম মৎস্য শ্রেণিবিন্যাসবিদ্যার তথ্যানুসারে Hilsa নামটি Regan ১৯৭১ সালে সালে প্রস্তাব করেছেন। আর একই মাছের নাম Fowler ১৯৩৪ সালে Tenualosa প্রস্তাব করেছেন। তাই অগ্রাধিকার আইন (Law of Priority) অনুযায়ী আমাদের জাতীয় মাছ ইলিশের নাম Tenualosa গ্রহণযোগ্য নয়। বরং Hilsa নামটিই গ্রহণযোগ্য ও সঠিক।

এবার দেখা যাক মৎস বিজ্ঞানীরা কেন মাছের রাজা ইলিশকে নানা নামে ডেকেছেন? Hilsa ও Tenualosa মাছের মধ্যে পার্থক্য কি? Hilsa ilisha মাছে কোন কালো দাগ থাকে না এবং জীবনচক্রের কোন দশাতেই এই দাগ পরিলক্ষিত হয় না। পক্ষান্তরে Tenualosa ilisha-র উভয় পাশের পৃষ্ঠ-পার্শ্বীয় দিকে ৬-৭টি খাড়া কোণাকৃতির দাগ (black spot) থাকে। Tenualosa ilisha শ্রীলংকার নদীসমূহ এবং বঙ্গোপসাগরের মধ্য পশ্চিমাঞ্চলে ও ভারত মহাসাগরের উত্তরাঞ্চলে পাওয়া যায়। বাংলাদেশের কোথাও এই দাগযুক্ত ইলিশ পাওয়া যায় না।

সুতরাং Hilsa ও Tenualosa দুইটি ভিন্ন প্রজাতি। Hilsa-কে বাদ দিয়ে Tenualosa প্রতিষ্ঠা করা যায় না। যদি এটি করা হয় তবে Hilsa নামটি থাকবে কোন মাছের? আর কী কারণেই বা Hilsa নাম বর্জন করতে হবে? Tenualosa নামটি গ্রহণ করার কারণই বা কী? অথচ Regun এই মাছটির নাম Hilsa দিয়েছেন ১৯১৭ সালে। অন্যদিকে Fowler মাছটির নাম Tenualosa দিয়েছেন ১৯৩৪ সালে। Whitehead ১৯৮৫ সালে পুনঃসংস্করণের নামে কেন Hilsa-র পরিবর্তে Tenualosa গ্রহণ করলেন? অথচ মাছ দুইটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য দাগমুক্ত (Hilsa)ও দাগযুক্ত (Tenualosa) এদেরকে স্পষ্টই আলাদা করেছে।

বাংলাদেশের স্বাদুপানির ইলিশের বৈজ্ঞানিক নাম Hilsa ilisha-ই Tenualosa ilisha নয়। Tenualosa ilisha হচ্ছে শ্রীলংকার ইলিশের নাম। হোয়াইটহেইড তার গ্রন্থের পুনঃসংস্করণে বাংলাদেশের ইলিশকে ভুল করে Hilsa ilisha-র পরিবর্তে Tenualosa ilisha করেছেন।মৎস বিজ্ঞানীরা একমত বাংলাদেশের জাতীয় মাছ রূপালী ইলিশের নাম Hilsa ilisha-ই, Tenualosa ilisha নয়। Tenualosa ilisha হচ্ছে শ্রীলংকার ইলিশের নাম এবং এটি একটি ভিন্ন প্রজাতির ইলিশ।

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে ইলিশের প্রজজন বৃদ্ধির জন্য নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এর মধ্যে প্রজনন সময়ে মৎস শিকার নিষেধজ্ঞা জারি করে এবং কঠোরভাবে তা বাস্তবায়ন করে তার ফলশ্রুতিতে গত এক দশক ধরে ইলিশের বাম্পার উৎপাদন হচ্ছে।এ বছর ৬৫ দিন নিষেধজ্ঞা থাকার পর গত ২২ জুলাই থেকে ইলিশ শিকার শুরু হয়েছে।ঝাঁকে ঝাঁকে রুপালী ইলিশ ধরা পড়ছে ট্রলার ও জেলেদের জালে। সবার মুখে হাসি। চট্টগ্রামের ফিশারিঘাট থেকে শুক্রবার সকালে বাংলাদেশের জাতীয় মাছ রুপালী ইলিশের ছবিগুলো তুলেছেনবাচ্চু বড়ুয়া।

Source: Bangladesh News Agency_bna/bnanews