হাটহাজারী পৌরসভা, যেখানে অনিয়মই নিয়ম
Home » হাটহাজারী পৌরসভা,যেখানে অনিয়মই নিয়ম
টপ ফোর বৃহত্তর চট্টগ্রাম

হাটহাজারী পৌরসভা,যেখানে অনিয়মই নিয়ম

।।আর করিম চৌধুরী।।

বিএনএ,চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের হাটহাজারী পৌরসভা।যেখানে অনিয়মই নিয়ম দাঁড়িয়েছে।অভিযোগ ওঠেছে, ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার।

কাউন্সিলররা অভিযোগ করেছেন,পৌর প্রশাসক রুহুল আমিন(উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা) নিজের ইচ্ছামতো উন্নয়ন প্রকল্প নির্বাচন করছেন।পাশাপাশি লেবার সাপ্লাই, মাটি ভরাটসহ যাবতীয় কাজের কোটেশন ছাড়া কাজের বিল নেয়া, জন্ম সনদ, ওরারিশ সনদ না দেয়া এবং আশ্রয়ন প্রকল্পের খালি প্লটে ঘর করার অনুমতি দিয়ে লোকজনের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও এনেছেন তারা।

তারা জানান, বাংলাদেশের ভোটার হওয়ার পিতা-মাতারা এমপি, উপজেলা জেলা চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বারদের ভোট দেয়ার পরও পৌর এলাকায় হোল্ডিং ট্যাক্স না থাকার অজুহাতে তাদের সন্তানদের জন্ম সনদ দেয়া হচ্ছেনা।ফলে অনেক গরীব ঘরের উপযুক্ত মেয়ের বিয়ে হচ্ছেনা এবং অভিভাবকরা সন্তানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সন্তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করতে পারছেন না।

পৌর বিদ্যুৎ লাইনম্যান মনোয়ারকে দিয়ে যাবতীয় মালামাল ক্রয়, লোবার সাপ্লাই, মাটি ভরাটের কাজ করে কোটেশন ছাড়া বিল উত্তোলন করা হচ্ছে।পাশাপাশি, মশার ওষুধ ক্রয়, গাড়ি মেরামত, বিভিন্ন খাল,ড্রেন পরিষ্কারকরণ, জলাবদ্ধতা অপসারণ, সড়ক ও জনপথ বিভাগের জায়গা উদ্ধারের নামে পৌর তহবিল থেকে ইচ্ছামতো টাকা খরচ করা হয়েছে।

এছাড়াও, আইন মন্ত্রনালয় থেকে ইজারাপ্রাপ্ত বর্তমান পৌর ভবন সংস্কারের নামে ৪০ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে।কয়েক মাস আগে পৌর এলাকার চারিয়া গ্রামে জোর ইজতেমার গেট নির্মাণে ২ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়।অলিপুরে সড়ক ও জনপথ বিভাগের জায়গার ওপর বিএস-১২০৮ দাগের পুকুর ভরাট করে শিশুপার্ক নির্মাণ করে পৌর তহবিল থেকে বিপুল টাকা অপচয় করা হয়েছে।পৌর এলাকার বিভিন্ন দরপত্রের কাজ হতে কাজ কম করে খেয়াল খুশীমতো অন্য জায়গায় কাজ করে পৌর সভার চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী বিদ্যুৎ লাইনম্যান মনোয়ারকে দিয়ে টাকা আদায় করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।এখানে কেউই প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেনা।অনেক সাহায্যপ্রার্থীর নামে সাহায্য বরাদ্দ দেখিয়ে টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

কাউন্সিলররা আরও অভিযোগ করেছেন,পৌরভার সৃষ্টি থেকে কোন ক্রয় কমিটি নেই।এই দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ লাইনম্যান মনোয়ারের নামে বিল করে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করে খরচ দেখানো হচ্ছে। পৌর সভার প্রধান হিসাবরক্ষকে বিনা কাজে একসঙ্গে ৫ মাসের বেতন পরিশোধ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।এর ফলে পৌর তহবিলের অপচয় হয়েছে।কাউকে না পাত্তা না দিয়ে পৌর প্রশাসক ইচ্ছামতো অপ্রতিরোধ্যভাবে পৌর তহবিলের অপচয় করছেন বলে কাউন্সিলরদের অভিযোগ।বিভিন্ন কাজের অজুহাত ও  ব্যস্ততা দেখিয়ে মাসিক পৌর প্রশাসক সভায় ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে সবকিছু পাশ করিয়ে নেন।

কাউন্সিলররা দাবি করেন,করোনাকালিন, পৌর ভবনের নুতন টিনশেড ভবনের উন্নয়ন কাজ, সরকার থেকে থোক বরাদ্দ ভিজিএফের চাল, ওএমএস কার্ড সংখ্যা কতো তারা কিছুই জানেন না।পৌর সচিব বিপ্লব মুহুরী, মোবাইলে কাউন্সিলরগণকে ফোন করে ভিজিএফের চাল,ওএমএস কার্ডের জন্য এলাকার গরীর অসহায় মানুষের আইডি কার্ড সংগ্রহ করে ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে জমা দিতে বলেন এবং কয়টি কার্ড জমা দেবেন তাও নির্ধারণ করে দেন।বিপরীতে কয়টি ভিজিএফ এবং ওএমএস কার্ড দেয়া হবে কাউন্সিলররা কিছুই জানেন না।

আবার প্রশাসক কর্মকর্তাদের দিয়ে আইডি কার্ড সংগ্রহ করে তাদের মাধ্যমে বিতরণ করেন।পরবর্তীতে পৌর সচিব, ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সহায়ক কমিটির সদস্যদের দিয়ে মাস্টার রুলে সই করিয়ে নেন।কিন্তু পৌর এলাকার বাইরের বিভিন্ন ওয়ার্ডের স্মার্ট কার্ড সংগ্রহ করে তালিকায় অর্ন্তভুক্ত করা হয়।এ ব্যাপারে ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ সোলাইমান এর প্রতিবাদ করলে পৌর সচিব তাকে হেনস্তা করেন।এ ঘটনার পর তিনি পৌর প্রশাসক বরাবর অভিযোগ দাখিল করেন।কিন্তু পৌর প্রশাসক সেটি আমলে না নিয়ে তার বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন।

কাউন্সিলর সোলাইমান বলেন,গত কোরবানীর ঈদে গরীবদের প্রধানমন্ত্রী অনুদান দেয়ার জন্য তালিকা চান পৌর সচিব।তার কথামতো তালিকা জমা দেয়া হয়।কিন্তু তাকে না জানিয়ে পৌর সচিব বিভিন্ন লোকের মাধ্যমে তা বিলি করেছেন।ফলে জনপ্রতিনিধি হিসেবে এলাকার লোকজনের কাছে হেয়প্রতিপন্ন হয়েছেন।এছাড়া, অনুদানের জন্য আইডি কার্ডধারীদের মোবাইল নম্বর দেয়ার কথা থাকলেও সেখানে পৌরসচিব তার মোবাইল নম্বরটি দেন বলে জানান তিনি।

সোলাইমান আরো  বলেন, পরে তাকে বিভিন্নজনকে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর অনুদানের মাস্টাররুলে দস্তখত করতে বলে পৌর সচিব।তার দেয়া তালিকার বাইরে তিনি দস্তখত করতে না চাইলে পৌর সচিব তাকে অপমান করেন। বিষয়টি জানিয়ে ১৯/০৭/২০২০ পৌর প্রশাসক বরাবর অভিযোগ দিলে সেটি পৌর সচিব গায়েব করে ফেলেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

কাউন্সিলর সোলাইমান বলেন,কোনকিছু আসলে সেটি মিটিং-এ উপস্থাপন করতে হবে এবং কাউন্সিলরগণের মাধ্যমে বিলি করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু সেটি মানা হয়নি।

৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর বশির আহমেদ বলেন, ২০১৯-২০ অর্থ বছরে তার ওয়ার্ডে ৩৪ লাখ টাকার ব্রিজের দরপত্র হয়।সেটি সেখানে না করে এক নম্বর ওয়ার্ডে পাহাড়ের পাদদেশে করা হয়েছে।কারণ সেখানে পৌরসভার চিফ ইঞ্জিনিয়ার বেলাল, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারি বিদ্যুৎ লাইনম্যান মনোয়ার এবং পিআইও জায়গা কিনেছেন।সেখানে যাওয়ার জন্য ব্রিজটি ওখানে করা হয়েছে।এছাড়া, চন্দ্রপুর মজর উল্ল্যাহ সড়ক ও চন্দ্রপুর হাজি হামিদ আলী সড়ক দরপত্র অনুযায়ী করা হয়নি। যতটুকু কাজ করার কথা ততটুকু করা হয়নি।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ লাইনম্যান মনোয়ার পৌরসভায় চাকুরিকালিন কখনো পিলারে ওঠেননি।তাকে দিয়ে সাপ্লাই থেকে শুরু করে সবকিছু করা হচ্ছে।পাশাপাশি মনোয়ারের নামে বিল ওঠানো হচ্ছে। তাছাড়া,এই চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়ম বহিভুতভাবে পৌরসভার মোটরসাইকেলটি ব্যবহার করছেন।

কাউন্সিলর সোলাইমানকে অপমান করার বিষয়ে পৌর সচিব বিপ্লব মুহুরী বলেন, একসঙ্গে কাজ করলে কথা কাটাকাটি হওয়াটা স্বাভাবিক।কাউন্সিলর সোলাইমান তার সঙ্গে বসে সেটি সমাধান করতে পারতেন বলেও জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর অনুদানের তালিকায় পৌর সচিবের মোবাইল নম্বর থাকার বিষয়ে বিল্পব মুহরী বলেন, যাদের মোবাইল নেই, তাদেরকে পৌর মেয়র বা সচিবের নম্বর দিতে প্রথমে নির্দেশ এসেছিল।কিন্তু নির্বাচিত মেয়র না থাকায় প্রশাসক দিয়েই পৌরসভার কাজ চলছে। সেক্ষেত্রে প্রশাসক বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকায় সচিবের নম্বরটি দেয়া হয়েছে।পরে নির্দেশ আসে যাকে অনুদান দেয়া হবে,তার মোবাইল নম্বর থাকতে হবে, অন্যথায় নয়।এরপর তালিকা সংশোধন করে জমা দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

বিপ্লব মুহরী বলেন, পৌরসভার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে সবকিছু প্রশাসককে জানিয়ে করা হচ্ছে। তার নির্দেশ মোতাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজ করছেন।

প্রশাসক বরাবর কাউন্সিলর সোলাইমানের চিঠি গায়েবের বিষয়ে পৌর সচিব বলেন, সেটি প্রশাসক জানেন, এ বিষয়ে তিনি করেন মন্তব্য করেননি।সরকারী সব অনুদান কাউন্সিলর এবং সহায়ক কমিটির সদস্যদের মাধ্যমে বিলি করা হয়েছে বলে দাবি করেন বিপ্লব মুহরী।

মাস্টার রুলে বেশি মানুষের দস্তখতের বিষয়ে তিনি বলেন, কিছু মানুষ সাহায্যের জন্য প্রশাসকের কাছে যান এবং আবেদন করেন, সে কারণে এমনটি করতে হয়েছে।তবে নিজের অবস্থানে পরিষ্কার আছেন জানিয়ে বিপ্লব মুহরী বলেন, এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন চাইলে তদন্ত করে দেখতে পারে।

এসব বিষয়ে পৌর প্রশাসক রুহুল আমিনের(উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা) কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর পৌর এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যাপক কাজ করেছেন তিনি। অসংখ্য রাস্তা সংস্কার,৫০টি মতো সরকারী খাস জায়গা উদ্ধার করে রাস্তা প্রশস্ত, খাল সংষ্কার, ড্রেন ও ব্রিজ নির্মাণ করেছেন। পাশাপাশি পৌর এলাকার উন্নয়নে ৫ কোটি ব্যয়ে ৬টি স্কিম হাতে নিয়েছেন জানিয়ে প্রশাসক বলেন, যা অল্প দিনের মধ্যে দরপত্র দেয়া হবে।

উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনায় কোন কমিটি আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২০১২ সালে পৌরসভা গঠিত হওয়ার পর থেকে সীমানা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে এখনো কোন নির্বাচন হয়নি। ফলে প্রশাসক দিয়ে পৌরসভা চলছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য একটি সহায়ক কমিটি আছে,যেখানে সাবেক জনপ্রতিনিধসহ অন্তত ২৩ জন আছেন, তাদের মতামতের ভিত্তিতে সবকিছু পরিচালনা করা হচ্ছে।

সচিবের বিরুদ্ধে কাউন্সিলরদের অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রশাসক বলেন, এ ব্যাপারে যারা অভিযোগ দিয়েছেন তারাই ভাল বলতে পারবেন। সচিব একজন সৎ ও ভাল মানুষ বলে দাবি করেন পৌর প্রশাসক।

একজন লাইনম্যান সাপ্লাই থেকে শুরু করে সবকিছু করছেন,এমন কি কোটেশন ছাড়া  তার নামে বিল উত্তোলন করা হচ্ছে-এমন প্রশ্নের জবাবে রুহুল আমিন বলেন, এ ব্যাপারেও যারা অভিযোগ করেছেন তারাই ভাল বলতে পারবেন। কয়েকটি প্রথম সারির আঞ্চলিক ও জাতীয় পত্রিকার নাম উল্লেখ করে প্রশাসশক বলেন, এসব পত্রিকার প্রতিনিধরা সবকিছু জানেন। কিছু সাংবাদিক নামধারী ইউটিউবার ও ফেসবুক ব্যবহারকারী আছেন, তারা না জেনে না বুঝে নানা অসত্য তথ্য দিচ্ছেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পাশাপাশি পৌর প্রশাসক হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন জানিয়ে রুহুল আমিন বলেন, এজন্য কোন বেতন পাননা তিনি। অব্যস্থতার মধ্যেও পৌর এলাকার উন্নয়নে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন।

জন্ম ও ওয়ারিশ সনদ নিয়ে গড়িমশি প্রসঙ্গে পৌর প্রশাসক বলেন, গত ২ বছরে ৩২ হাজার সনদে সই করেছেন তিনি। এই অভিযোগটি মোটেই সত্য নয় বলে দাবি করেন প্রশাসক।

তবে,কাউন্সিলররা বলেছেন, অডিট টিম দিয়ে পরীক্ষা এবং দুনীতি দমন কমশনকে দিয়ে তদন্ত করলে এসব অনিয়ম ও দুনীতির তথ্য বেরিয়ে আসবে।পাশাপাশি ২০১৯-২০ অর্থ বছরের চেক রেজিস্টার, চেকের মুড্ডা ও চেকের সই দেখলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে বলে জানান তারা।

বিএনএনিউজ/এসজিএন